সরস্বতী যুগে যুগে ।। সুশান্ত কুমার রায়

0
687
সরস্বতী যুগে যুগে ।। সুশান্ত কুমার রায়

সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে।
বিশ্বরূপে বিশালাক্ষি বিদ্যাং দেহি নমোহস্তুতে॥

সরস্বতী বিদ্যার দেবী। শুভ্র তাঁর গায়ের রঙ। সরস্বতী শ্বেতপদ্মাসনা। এক হাতে পুস্তক অন্য হাতে বীণা। তাঁর হাতে বীণা থাকায় ‘বীণাপাণি’ বলা হয়। সরস্বতীর প্রিয় বাহন শ্বেত হংস। সরস্বতী পরম করুণাময়ী। তাঁর কণ্ঠদেশে রয়েছে মুক্তাহার। তিনি প্রজ্ঞা, মতি, মেধা ও স্মৃতি। কোন কার্যারম্ভের পূর্বে সরস্বতী বন্দনা অবশ্য পালনীয়। মাঘ মাসের শুক্ল পক্ষের পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী পূজা হয়। দেবীরূপে সরস্বতী ভারতীয় কাব্য-ঐতিহ্যে অনন্তকাল ধরে পূজিতা। সমস্ত সংস্কৃত সাহিত্যে সরস্বতী বন্দনা লক্ষ্য করা যায়। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে এমন কোন কাব্য রচয়িতা নেই যার কাব্য কবিতায় সরস্বতী বন্দনা নেই। তাই তো কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে-“তুমি মানসের মাঝখানে আসি / দাঁড়াও মধুর মুরতি বিকাশি / কুন্দবরণ সুন্দর হাসি / বীণা হাতে বীণাপাণি”…।

পাশ্চাত্য সাহিত্যেও হোমার, ভার্জিল, মিল্টন প্রভৃতি কবিগণ তাঁদের কাব্য ও মহাকাব্যে সরস্বতী বন্দনা করেছেন। সৌন্দর্য ও শুভ্রতায় তিনি কখনো জননী, কখনো প্রেয়সী আবার কখনো কন্যা। সরস্বতীর জন্ম সম্পর্কে নানাবিধ মতবাদ প্রচলিত আছে। ব্রহ্মবৈর্বত্ত পুরাণ অনুযায়ী সরস্বতী শ্রীকৃষ্ণ মুখ থেকে উদ্ভুতা। অন্যদিকে আবার নারদীয় পুরাণ, ধর্মপুরাণ ও কূর্মপুরাণ অনুযায়ী তিনি শিব-দুর্গার কন্যা। পুরাণে দেবী সরস্বতী শিবকন্যা ও শিবশক্তি। আবার বরাহ পুরাণ অনুযায়ী ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের মিলিত দৃষ্টিশক্তিতে বিদ্যেশ্বরী মা সরস্বতীর জন্ম। পুরাণ শাস্ত্র অনুযায়ী ব্রহ্মাণী, কখনো ব্রহ্মার কন্যা, কখনো বিষ্ণুশক্তি আবার কখনো শিবশক্তি হিসেবে বিরাজমান। তাই সরস্বতী একই দেবীমূর্তিরূপে বিভিন্ন, স্বরূপে অভিন্না। পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী মাঘী শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী নৈবদ্য লাভ করতে শুরু করেন। মাঘী শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী পূজা হয় বলে একে “সারস্বত উৎসব” বলা হয়। পঞ্চমী তিথিতে শ্রী স্কন্দকে আশ্রয় করেছিলেন বলে এই উৎসবের নাম হলো “শ্রীপঞ্চমী”। ‘সরস’ শব্দের অর্থ ‘জল’। তাই সরস্বতী নদীরূপা। সত্ত্বগুণাত্বিকা সরস্বতী ব্রহ্মারই শক্তি। সরস্বতী জ্যোতির্ময়ী, বিদ্যার প্রধান অধিষ্ঠাত্রী দেবী। অন্যদিকে আবার ‘বাক্ই’ সরস্বতী অর্থাৎ সৃষ্টির আদিকারক ‘বাক্’ বা ‘শব্দব্রহ্ম’ তাই তিনি বাগদেবী। প্রথমে সরস্বতী নদীরূপা, পরবর্তীকালে বাক্রূপা। “ওঁ ভদ্রকালৌ নমো নিত্যং সরস্বত্যৈই নমো নমঃ”। ভদ্রকালী সরস্বতীতে বলিপ্রদানের প্রচলন আছে। ভদ্রকালী সরস্বতী নীলাভ। বরিশাল, পাবনা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর অঞ্চলে নীল সরস্বতীর কাছে বলিদানের প্রথা প্রচলিত আছে বলে জানা যায়। সাদা বর্ণের ছাগল বলি দেয়াই শাস্ত্রীয় প্রথা হিসেবে প্রচলিত। অন্যদিকে বরিশাল, সিরাজগঞ্জ, ময়মনসিংহ প্রভৃতি স্থানে সরস্বতী পূজার দিন প্রথমে ইলিশ মাছ খাওয়ার রীতি প্রচলিত আছে বলে জানা যায়। কোথাও কোথাও জোড়া ইলিশ খাওয়ার রীতি প্রচলিত।

শাস্ত্রীয়মতে সরস্বতী পূজায় বলিপ্রদান ও আমিষ ভক্ষণ নিষিদ্ধ নয়। সরস্বতী পূজায় বলিদান প্রসঙ্গে ‘ঐতরেয়’ ও ‘শতপথ ব্রাহ্মণে’ কাহিনীর অবতারণা আছে। সেই কাহিনী থেকে জানা যায়, সরস্বতী নমুচি দানব বধের জন্য স্বর্গরাজ ইন্দ্রকে যোগমুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে সৌত্রামনী যজ্ঞের আয়োজন করা হয়। ফলে তিনি বলি স্বরূপ মেষ প্রাপ্ত হন। তৈত্তিরীয় সংহিতায় বলা হয়েছে যে, বাকশক্তি সম্পন্ন কোনো ব্যক্তি যদি ভালোভাবে কথা বলতে না পারেন তবে তাঁকে বাকশক্তির জন্য দেবীর আরাধনায় মেষ প্রদান করলে সরস্বতীর অনুগ্রহে বাকবিভব প্রাপ্ত হবেন। অশ্বমেধ যজ্ঞেও সরস্বতীর জন্য বলি প্রদান করা হয় বলে শাস্ত্রীয়ভাবে জানা যায়। বৌদ্ধ তন্ত্রেও দেবী সরস্বতীর রূপকল্পনা আছে। বৌদ্ধরা যে মহাসরস্বতী, বজ্রবীণা সরস্বতী, বজ্রসারদা ও আর্যবজ্র সরস্বতী মূর্তির ধ্যান করেন তার মূলে আছে মাতৃকামূর্তি। বৌদ্ধতান্ত্রিক যুগে সরস্বতী দেবী সম্পূর্ণ বৌদ্ধধর্মের অঙ্গীভূত। বৌদ্ধধর্মে শ্রেষ্ঠ বোধিসত্ত্ব অবলোকিতেশ্বর। তারপরেই মঞ্জুশ্রীবিদ্যার অধিপতি বলে তাঁর অপর নাম বাগীশ্বর। জৈনশাস্ত্রে সরস্বতীকে আবার ‘শ্রুতদেবী’ রূপে অভিহিত করা হয়েছে। দেবী সরস্বতী সত্যপ্রিয়া, বাক্যময়ী, কল্যাণী, সুন্দরগমন, সুনৃত বাক্যের উৎপাদয়িত্রী, সুমতি শিক্ষয়িত্রী ও জ্ঞানোদ্দীপনকারী। এ অনন্ত চরাচরে জন্ম মৃত্যুময় ধরণীতে চলমান মানব জীবনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে সরস্বতী পূজা এক গভীর তাৎপর্য ও গুরুত্ব বহন করে। রাষ্ট্রীয় জ্ঞান অর্জিত হয় বিদ্যা দেবীর কল্যাণেই। সরস্বতী বীণা ঝংকারে প্রশান্তি ও শান্তির বারতা সংগীত বাদিত হয় আকাশে বাতাসে। রাষ্ট্রীয় জ্ঞান হয় স্বতঃপরিস্ফুট। প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে বিদ্যাদেবীর গীত বন্দনায় শিক্ষার্থী ও ভক্তরা স্কুল, কলেজ, মন্দির ও উপসনালয়ে সরস্বতী পূজার আয়োজন করে। বেলপাতা, চন্দন, ফুল দিয়ে ভক্তি সহকারে অঞ্জলি প্রদান করে। এই দিনটিতে স্কুল, কলেজ ও মন্দিরে মন্দিরে সরস্বতী আরাধনায় সবাই এক হয়ে যায়।