লাল লিপিস্টিক ।। তাহমিনা শিল্পী

0
875
লাল লিপিস্টিক ।। তাহমিনা শিল্পী
লাল লিপিস্টিক ।। তাহমিনা শিল্পী

আমার একটা নাম ছিল। এখন নাই। লাশ কাটি, তাই সবাই আমারে ডোম নামেই ডাকে।আবেগ-অনুভূতিও মইরা গেছে। কোন কিছুই আর গায়ে লাগে না। কিন্তু আজকের ব্যাপারটা অন্যরকম। চৌদ্দ/পনের বছরের একটা মাইয়ার লাশ কাটার সময় তার বুকের ভাঁজে একটা লাল লিপিস্টিক পাইলাম। মা’র কথা মনে খুব পইরা গেলো।

আমার তখন সাত বছর বয়স। বড় বইনের তের চৌদ্দ হবে। একদিন হঠাৎ বুক চাইপা ধইরা, দুইডা কাশ দিয়া আব্বায় মইরা গেলো। আমার মা বিধবা হইল। আমরা হইলাম এতিম। দাদার ভিটায় বাপের বানানো দোচালা ঘরে থাকি।পাশের ঘরটা বড় চাচার। মায়ের একটা সেলাই মেশিন ছিল। গঞ্জের দর্জি দোকান থিকা টুকটাক সেলাই কাজের অর্ডার আনতো। বাড়ি বইসা কাজ কইরা আবার ফেরত দিয়া আসতো। যা রোজগার হইত, তাতে আমাগো তিনজনের খাওয়া-পড়ার খুব একটা অসুবিধা হইতো না।

একদিন গঞ্জ থেকে বাড়ি ফেরার পর মা পাকঘরের কাজে গেলে বড়চাচা গোপনে মায়ের ব্যাগ ওলট-পালট কইরা কী যেন খোঁজে। আমি আড়াল থেকে দেখি। কিছু বুঝতে পারি না। একটা লাল রঙের লিপিস্টিক পাইয়া বড়চাচা খুব হৈচৈ শুরু করল। মা দৌড়াইয়া আসলো। বড় চাচা চিৎকার কইরা কইল, বেশ্যা মাগী। গঞ্জে যাওয়ার নাম কইরা এইসব কইরা বেড়াও।আমাগো বংশের মুখে চুনকালি মাখাইতে শরম করলো না? আমার মরা ভাইডার মান-সম্মানের কথা মনে হইল না? মায়ের চুলের মুঠি ধইরা কইল, আজকে তোরে মজা বুজাইতাসি। মা বারবার কইল, বিশ্বাস করেন ভাইজান, মাইয়াডা শখ কইরা চাইলো। তার জন্য আজকেই হাঁটে থিকা কিনা আনছি। আমি কোন পাপ করি নাই। আমার পোলা-মাইয়ার কসম। আমার বেহেস্তবাসী স্বামীর কসম।

বড় বইনেও বড়চাচার পা ধইরা কইল-চাচা, মা’র কোনো দোষ নাই। মেয়ে পুতুলের বিয়ার দিন সাজমু। তার জন্য‌ি আমি মা’রে কইছিলাম একটা লাল লিপিস্টিক আইনা দিতে। বড়চাচা কোন কথাই শুনল না। রাগে গরগর করতে করতে বাইর হইয়া গেল। সন্ধ্যায় বাড়িতে শালিস বসল। মাতবর রায় দিল, মায়ের গায়ে একশটা বেতের বারি মারা হবে। সবার সামনে উঠানে নাকে খত দিতে হবে। ছেলে-মেয়ে নিয়া কাল সকালেই গেরাম থিকা চইলা যাইতে হবে।

সেইরাতে মায়ের খুব জ্বর আসলো। জ্বরের ঘোরে বারবার কইল, ইয়া আল্লাহ! তুমি এই শয়তানগো বিচার কইরো। যারা সম্পত্তির লোভে আমার মাছুম বাচ্চাগো বাপের ভিটা ছাড়া করতা চায় তাগো শাস্তি তুমি দিও। সকালে বাড়ির পুকুরে ভাইসা উঠল বড় বইনের লাশ। সবকিছুর জন্য নিজেরে দায়ী মনে কইরা সে ডুইবা মরছে। মায় তখন শোকে পাথর। আমি কিছুই বুঝতে পারি না। বড়চাচা টানতে টানতে আমাগো বাড়ির বাইরে দিয়া গেলো। গেরামের মানুষ বেশ্যা মাগী, দূর হ, দূর হ বইলা মা’রে গালি দিল।

বিকালবেলা শহরে পৌঁছাইলাম। মা তখনও জ্বরে প্রায় বেহুশ। আমি ক্ষিদায় কাহিল। আমরা যেই ফুটপাতে বইসা ছিলাম, সেইখানে একটা গাছের নিচে সন্ধ্যার দিকে কয়জন মাইয়া মানুষ আইলো। সবারই ঠোঁটে লাল টুকটুইক্কা লিপিস্টিক। একে একে কয়েকজন পুরুষ মানুষ আসলো, কী জানি কী কথা কইল! তাগো সবার সাথে একজন কইরা মাইয়া মানুষ হাসতে হাসতে চইলা গেলো। আমি কিছুই বুঝলাম না। মায়ের গোঙানীর শব্দ শুইনা একজন মাইয়া মানুষ আমাগো কাছে আসলো। সাথে কইরা তার ঝুঁপড়িতে নিয়া গেলো। আমারে খাইতে দিলো, মা’রে ওষুধ দিলো। তিনদিন পর সুস্থ হইয়া মায় এদিক-সেদিক কাজের জইন্য ঘোরাঘুরি করল, পাইলো না।

তারপর একদিন আমার মায় সাদা কাপড় ছাইড়া রঙিন কাপড় পড়লো। রোজ সন্ধ্যায় লাল লিপিস্টিক দিয়া ওই মাইয়া মানুষগো লগে যাইয়া রাস্তায় খাড়াইতো। কিছুক্ষণ পরে সাথে কইরা একজন পুরুষ মানুষ নিয়া আইতো। আমারে কিছু সময়ের জন্য ঝুঁপড়ির বাইরে দাঁড় করাইয়া রাখতো। আমি দরজায় কান পাইতা থাকতাম।ভিতর থেকে ছোটছোট কথা, গোঙানীর শব্দ স্পষ্ট শোনা যাইতো। পুরুষ মানুষটা যাওয়ার সময় মায়ের হাতে কয়টা টাকা দিয়া যাইত। মা অগোছালো শাড়ির আঁচলে গিঁট দিয়া রাখতো।আর আমারে বুকে জড়াইয়া ধইরা কানতো। আমি এসবের কিছুই বুঝতে পারতাম না।

মা আমারে পড়াশোনা করানোর খুব চেষ্টা করছিল। যে কয়দিনই স্কুলে গেছি, লাল লিপিস্টিকের রহস্য ভাবতে ভাবতে সময় পার হইয়া যাইত, পড়া বুঝতে পারতাম না। যখন সব বুঝলাম তখন মা’রে কিচ্ছু না কইয়া গেরামে গেলাম। বড়চাচারে খুন কইরাম। দুঃখের বিষয় হইল ধরা খাইয়া জেল খাটলাম বারো বছর। বিশ্বাস করেন আমার কোন আফসোস হয় নাই।

ছাড়া পাইয়া মায়ের খোঁজে গিয়া শুনি, আমি জেলে যাওয়ার পরই মা কইছে, এইবার তার লাল লিপিস্টিকের দরকার ফুরাইছে। তারপর কোথায় জানি চইলা গেছে, আর ফেরে নাই। এখনও আমি লাল লিপিস্টিক কিনা ঘরে সাজাই রাখি।যদি কোনদিন মায়ের দেখা পাই!