মৃত্যুর শহর ।। মানজারুল ইসলাম দুলাল

0
787
মৃত্যুর শহর ।। মানজারুল ইসলাম দুলাল
মৃত্যুর শহর ।। মানজারুল ইসলাম দুলাল

শীত নেই বল‌লেই চ‌লে। কিছুটা শী‌তের অাভাস দেখা যাচ্ছে। মনে হালকা সমীরণের টান, রাতে কাঁথা গায়ে ফ্যানের চক্রাকার প্রবাহ বেশ ভালোয় লাগে। মাঝে মধ্যে প্রবাহের টানে জ্বর-সর্দি, কাশি, মাথা ব্যথা লেগেই থাকে। এই চক্রাকারে প্রবাহ বন্ধ হয় না, অভ্যাস হয়ে গেছে। হাতুরে ডাক্তার আছে, সমস্যার সমাধানও আছে তাই আরকি! এই শহরে অলিগলি, মানুষ, প্রকৃতি সবই অপরিচিত। নেই কোন প্রতিবেশি, নেই কোন বন্ধু-বান্ধব, নেই অপরিপক্বদের খেলার মাঠ। আছে শুধু কোলাহল, দূষিত বাতাস আর অবিশ্বাসীদের আনাগোনা।

হাবিব গ্রামের পরিবেশে বড় হয়েছে। বিশাল মাঠ আর প্রকৃতির নীলাম্বর ভালবাসা, কর্দমাক্ত দেহ নিয়ে ছুটোছুটি, কখ‌নো বা মারামারি। তাই শহরে ঠিকঠাক ভাবে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছে না। তার ভিতরে প্রশ্নগু‌লো ঘুরপাক খাচ্ছে। মানুষের আচার-ব্যবহার, কথাবার্তা কেমন জানি ব্য‌তিক্রম! মানুষগুলো কেমন জানি, দিনের বেলায় সমাজকামী, রাতের বেলায় গণকামী।এইগুলো প্রশ্ন তার জাগ্রত হয় টি-স্টল থেকে, সেখানে বিভিন্নধর্মী লোকের আনাগোনা ও পায়ের আওয়াজের শব্দ তার বিভিন্ন প্রশ্নের জন্ম দেয়।

হাবিব বেশি দূর লেখাপড়া করতে পারেনি। এসএসসি পর্যন্ত তার শেষ গণ্ডি। শহরে এসেছে একটি চাকুরীর খোঁজে। চাকুরীর জন্য সে, সকাল-দুপুর ও সন্ধাব্দী চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিছু‌তেই কিছু হ‌চ্ছে না। তবু সে হতাশার স্বপ্ন দে‌খে না।

হাবিব তার গ্রামের বন্ধু ফরিদের বাসায় অাপাতত উ‌ঠে‌ছে। হাবিব যথারীতি রাতের দিকে ফরিদের বাসায় ফে‌রে। ফরিদ তার জবের কথা জিজ্ঞাসা করল। সে বলল, চেষ্টা করছি বাট হচ্ছে না। ফরিদ বলল, ঢাকা শহর বড়ই নিষ্ঠুর। নেই কোন বন্ধুত্ব, নেই সামাজিকতা, নেই কোন অা‌তি‌থেয়তা।

এই শহরে মাছ আর গেস্ট একই বিষয়। তিনদিনের বেশি হলেই দুর্গন্ধ ছড়ায়। ফ‌রিদ বলল, তুই তো বুঝতে পারছিস আমি একজন বেকার ছেলে। নিজেই চলতে পারি না, তার মধ্যে আবার তুই। হাবিব কখনো ভাবতে পারেনি তার বন্ধুর মুখ থেকে এমন বাণী শুনতে হবে। তবু নি‌জে‌কে মানিয়ে নিতে হবে বাস্তবতার খা‌তি‌রে।

আসলে বাস্তবতা অনেক কঠিন। সবার সঙ্গে মিলে সব কাজ করা গেলেও সবার দুখের ভাগিদার কেউ হতে চায় না। স্বাধীনতার কাছে তুমি সকল সুখ যেমন দাবি করতে পারো না, তেমনি সকলের দায়িত্ব নিতে কেউ চায় বলে আমার বোধগম্য নয়। আকাশটা বিশাল মনে হলেও, আকাশটা কিন্তু স্বাধীনভাবে চলতে পারে না। মেঘগুলো তার স্বাধীনতাকে নষ্ট করে দেয়। তেমনিভাবে সমাজে ধনবান ব্যক্তিগুলো যদি ইচ্ছে করে সমাজের সকল অপকর্ম দূর করতে চায়, তবু তা দূর হবে বলে মনে হয় না।
কারণ, নিজের স্বাধীনতা আর সচেতনতা না থাক‌লে কখনো কোন কর্ম বা কাজ সঠিকভাবে পরিগণিত হয় না।

ফ‌রিদ আরও বলল, তুই অনেক কষ্ট সহ্য করতে পারিস। আমি সেই বাল্যকাল থেকে তোকে দেখছি। তুই অনেক কষ্ট করে নিজেই উপার্জন করে পড়ালেখা করিস। বন্ধু, তুই ভাল কিছু করবি একদিন। দুজন কথোপকথন শেষে ঘুমিয়ে গেল। কিন্তু হাবিবের চোখে ঘুম আসছে না। সে এখন কী কর‌বে ভাবতে লাগল। যেখানে যায় সেখানেই আমাকে কেউ কাজ দেয় না। এভাবে আর কতদিন? তার মধ্যে ফরিদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। এই চিন্তা করতে করতে ঘুমের ভান ধরে বিছানায় কাত হয়ে পড়ে রইল। নিজের কাছে নিজের জীবনটাই অসহ্য লাগছে। নিজেদের সম্পত্তি থাকা সত্ত্বেও চাচা আমাকে নিঃস্ব করে দিল।

ছোটকালেই বাবাকে হারিয়ে মায়ের কোলে বেশি দিন সুখ অর্জন করতে পারলাম না। এক‌দিন মা কী এক আর্তবেদনায় কাতর হয়ে আমাকে ছেড়ে ওপারে চলে গেল। তারপর পৃথিবীতে সুখ নামক বস্তু আছে বলে আমার মনে হয়নি। আস‌লে সুখ দেখতে কেমন? তার আকার কেমন? সে কোথায় বাস করে? নগরে নাকি ভদ্রপল্লীতে? নাকি আমার চাচার নিলয়ে?

সুখের নেশা বড় নেশা। আমার নেই কোন ঘরবাড়ি। আমার সুখটি থাকবে কোথায়? তারও থাকার একটি স্থান দরকার। নির্ঘুম রাত কে‌টে গেল। সকাল বেলার নাস্তা নেই। তার মানে কাজের খালা নেই। সবাই যার যার কাজে চলে গেল। আ‌মি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বাসা থেকে বের হয়ে টি-স্টলে গিয়ে একটি বিস্কুট আর দুধ চা নিয়ে খেতে শুরু করলাম। এমতাবস্থায় মানিক এ‌সে হাজির। তার স‌ঙ্গে দুদিনের পরিচয়। সে একটি কোম্পানিতে চাকুরী করে। অ‌নেক বেতন পায়। আমার ব্যাপা‌রে তাকে সব কথা বলে‌ছি। চাকুরীর আশ্বাস দিয়েছে।

: কী ব্যাপার হাবিব, এই সাতসকালে মামার দোকানে?
: সারা রাত টেনশ‌নে ঘুম হয়নি। তাই চা পান করতে এলাম।
: খুব ভালো করেছ। তো তুমি কি কাজ করতে পারবে? ধরো, তোমা‌কে কিছু প্রোডাক্ট দিলাম। দোকানে দোকানে গিয়ে বিক্রি করতে হবে।
: এটা তো সহজ কাজ, না পারার কী আছে?
: ওকে, সন্ধায় তু‌মি দেখা করো।

তারপর কা‌জের ব্যস্ততায় সে চা না খেয়েই চলে গেল। কাজটি পেয়ে আমার কিছুটা ভাল লাগা শুরু করল। এমনকি হাবিবকে গিয়ে বললাম, আমার তো জব হয়ে গেছে। সে বলল, গুড বন্ধু চালিয়ে যা। আর রাতের কথায় মন খারাপ করিস নাঅ বুঝতেই তো পারছিস।

সন্ধায় মানিক ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হলো। সে আমাকে তার অফিস কক্ষে নিয়ে যাবার কথা ব‌লে নি‌য়ে গেল একটি ফ্যামিলি বাসায়। সেখানে যাবার পর দেখলাম অনেক লোক বসে আছে, কেউ বা দাঁড়িয়ে। আমাকে একটি কক্ষে নিয়ে গি‌য়ে বলল, তোমার বাসায় কে কে আছে? বললাম, ভাই, আমার তো বাড়িতে কেউ নেই!
এমনকি আমার বাড়ি পর্যন্ত নেই। তারা কো‌নো কথা বিশ্বাস না করে আমার হাত পা রশি দিয়ে বাঁধল। আর বলল, তোর বাবা-মাকে ফোন দে। বল, আমাকে কিডনাপ করা হয়েছে।
পাঁচ লক্ষ টাকা না দিলে সকালেই আমাকে মেরে ফেলবে। আমি বললাম, মানিক ভাই, আমার কেউ নাই। আমার কোন টাকা নেই, তুমি চাকুরী দিবে বলে সরল বিশ্বাসে তোমার সঙ্গে এসেছি। আর তুমি কিনা আমার সাথে এই অমানবিক আচরণ করতে পারলে! সে বলল, তুই কাকে বলিস মানিক? আমি তো কচু খান। টাকা না হলে মানুষকে কচুর মত করে কাটি। তোকেও কাটব, বেশি কথা না বলে রাতের মধ্যে ফোন করে টাকা নিয়ে আয়, না হলে তোর গর্দান যাবে।

মৃত্যু কামনা ছাড়া আর কোন পথ নেই। কে দিবে এত টাকা? তা‌কে কে রক্ষা করবে এই জালিমদের হাত থেকে? চাচাকে ফোন করে কোন লাভ হবে না। কারণ, সে তো টাকা দিবেই না বরং চাইবে যেন তার মৃত্যু দ্রুত হয়। তার চেয়ে মৃত্যুকে বরণ করে নেয়াই শ্রেয়। সকালে সূর্য ওঠার পূর্বেই আমার মৃত্যুর ঘণ্টাধ্বনি বাজবে। এই কথাটি ভাবতেই কাঁদতে শুরু করল হাবিব। সে বলছে আমি বাঁচতে চাই। এই পৃথিবীর আলো বাতাস নিয়ে আমি বাঁচতে চাই। হে আমার পালনকর্তা! তুমি আমাকে রক্ষা করো। তুমি ছাড়া এই পৃথিবীতে আমার আর কেউ নেই। মা‌টি‌তে তার রক্তাক্ত দেহ পড়ে রইল। গর্দার মোড়ে ছোট্ট প্রাচীর ঘেরা সরোবরে। এই পৃথিবী নিষ্ঠুর! মানুষগুলো নিষ্ঠুর, শুধু ভালবাসা ও মায়াগুলো বেঁচে রবে এই পৃথিবীর বুকে অনন্তকাল।