বিধবা।। মোজাম্মেল হক

0
208
বেকার জীবন ।। মিনহাজুল আবেদীন তুষার

ছোট গল্প


খুব বেশিদিন কি হলো?
যেদিন গাঙ্গিনার পাড়ে ছাতার নিচে তোমার সাথে প্রথম দেখা হলো, সেদিন কিন্তু তোমাকে খুবই নার্ভাস দেখাচ্ছিল।
সেদিন আমার যে কি হয়েছিলো, এতো কথা য়ে কিভাবে বললাম, আজো মনে হলে লজ্জা পায় আমার। আচ্ছা সেদিন তুমি অমন বোকার মতো নিচদিকে তাকিয়েছিলে কেনো?

যেখানে এসেছোই কথা বলতে, অথচ মুখ দিয়ে তোমার কথাই আসছিলো না। কি কারনে যে তুমি আমায় পছন্দ করলে? এখনো আমার মাথায় আসেনা।

আমারও তোমাকে কেনো যে পছন্দ হলো! অথচ তোমার মতো মুখচোরা ছেলেদেরকে আমি কখনোই পছন্দ করতাম না। তারপরও তোমাকেই জীবন সঙ্গী হিসেবে বেছে নিলাম। ভালোই তো চলছিলো সব।

দু-জনেরই সরকারি চাকরি হলো, ঘর আলো করে আগমন হলো আমাদের সন্তানের। সবকিছু মিলে তুমি কতোটা সুখী ছিলে জানিনা, তবে আমি কিন্তু খুবই সুখী ছিলাম সবাইকে নিয়ে।

যেদিন তুমি বুকে ব্যাথা নিয়ে প্রথমবার ঘরে ফিরলে, সেদিন কিন্তু খুব ভয় পাইনি আমি। পরেরদিন সকালে তোমার মুখটা কেমন যেনো বিকৃত দেখাচ্ছিলো।

তখনই প্রথম কলিজায় একটা সুক্ষ্ম চিনচিনে বেদনা অনুভব করি। বেলা বাড়ার সাথে সাথে তোমার বুকের ব্যাথাটাও বাড়তে থাকলো। এক সময় তুমি সংগা হারালে।

তারপরে বাড়িতে এ্যাম্বুলেন্স এলো, সবাই যখন ধরাধরি করে তোমাকে এ্যাম্বুলেন্সে উঠিয়ে দিলো, তখনি প্রথম ভিতরটায় শুন্যতা অনুভব হতে লাগলো।

তারপরে এ্যাম্বুলেন্সটা যখন দৃষ্টিসীমার বাইরে গেলো, তখন আর নিজের উপরে কোনো অবরোধ রইলো না। আমি বিলাপ করে কাঁদতে কাঁদতে একসময় সংগা হারালাম।

এভাবে কতক্ষণ কেটে গেছে জানিনা। জ্ঞান ফেরার পরে নিজেকে আবিষ্কার করলাম সরকারি হাসপাতালের বিছানায়।

জ্ঞান ফেরার পরে প্রথমেই জানতে চাইলাম তুমি কেমন আছো? আশেপাশে যারা ছিলো কেউ আমার প্রশ্নের উত্তর দিলোনা। আমার বুঝতে একটুও কষ্ট হলোনা যে, তুমি আর আগের অবস্থায় নেই। তোমার  শারীরিক

অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে।

বাড়ির সবাইকে বললাম, আমি তোমার কাছে যেতে তাই। এও বললাম, এখন ওর পাশে আমার থাকা প্রয়োজন। কেউ আমার কথা শুনলো না। শেষমেশ তোমার ছোটভাই বললো ভাবী চলো, আমি তোমাকে নিয়ে যাবো।

আমি যেনো আকাশের চাঁদ হাতে পেলাম। আমার কি করা উচিৎ, কি নেওয়া উচিৎ অথবা উচিৎ না, সেসবের প্রতি আমার খেয়াল ছিলোনা। ছেলেটাকে কোলে নিয়ে তোমার পছন্দের কয়টা সন্দেশ আর একটু বাদাম ভর্তা নিয়ে রওনা করলাম তোমার কাছে।

যেয়ে যখন দেখলাম, তুমি তখন কাঁচের ঘরের ভিতরে একটা বিছানায় সংগাহীন পড়ে আছো। তোমার সারা শরীরে কতোগুলো তাঁর প্যাচানো, আর নাক ও মুখের ভিতরে মোটামোটা নল ঢুকিয়ে রেখেছে। তখন মনে হলো আমি যে তোমার পছন্দের সন্দেশ আর বাদাম ভর্তা নিয়ে এসেছি, সেটা আর তোমার খাওয়া হলোনা।

ওই অবস্থায় তোমাকে দেখে ভিতরটা চুরমার হয়ে গেলো, কিন্তু বলবার মতো কাউকে আমার পাশে তখন পাইনি। এভাবে জমে মানুষে টানাটানি চললো তেরো দিন। একসময় তুমি পারি জমালে তোমার অনন্ত ঠিকানায়।

তার পরের আর কিছু মনে নেই আমার। আমার পুনরায় জ্ঞান ফেরার পরে জানতে পারলাম, তিনদিন আগে তোমাকে কবরস্থ করা হয়েছে।

নাকে হাত দিয়ে দেখি আমার নাক ফুলটা আর নেই। তখনই বুঝলাম, তোমার সাথে আমার সধবারও মৃত্যু হয়েছে। আমি এখন বিধবা।।