পাঁচশ টাকার বিয়ে ।। খোশবুর আলী

0
236



আ‌মি গ্রামে বসবাস করি। নিজ গ্রাম ছাড়াও আশপাশের কয়েকটি গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ আমার পরিচিত। আমার পাশের গ্রাম শিকপুর। সেই গ্রামের প্রায় আশিভাগ মানুষ আমার চেনা। শিক্ষক হিসেবে অ‌নে‌কেই আমা‌কে য‌থেষ্ট সম্মান করেন। আমিও তাদেরকে সম্মান জানাই। দেখা হলেই সালাম বিনিময় করি, খোঁজ-খবর নিই। আজ সকালে আমার দোকানে এসে সবেমাত্র বসলাম। এমন সময় আমার দোকানের সামনে দিয়ে শিকপুরের এক মুরুব্বি হেঁটে যাচ্ছিলেন। আমি একটু জোরেশোরে মুরুব্বির উদ্দেশ্যে সালাম দিলাম। সালামের জবাব দিয়ে উনি মুসাফাহা করার জন্য আমার দি‌কে এগিয়ে এ‌লেন। এরপর বললাম, এত সকালে এদিকে কী মনে করে বাবাজি?

কিছু না বলে দাঁড়িয়ে রইলেন। আমি বসতে বললাম। বাবা‌জি বসলেন। তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম বেশ বিপদে আছেন। মুখটা কাচুমাচু করে বললেন, বাবা, আমি একটু গিয়েছিলাম মজিবুর মেম্বারের কা‌ছে। আসলে মজিবুর মেম্বার না, তার স্ত্রী মহিলা মেম্বার। সেই সুবাদে সবাই তাকে মজিবুর মেম্বার বলে ডা‌কেন।

আমি বললাম, কী কাজ এত সকালে?
তি‌নি বল‌লেন, কী বলব বাপু! বলতে লজ্জা লা‌গে। কিন্তু না বলে আর পারছি না। আমার একটি বড় মেয়ে আছে। তার বিয়ের জন্য একটু সাহায্য চাইতে গি‌য়েছিলাম। আ‌মি গরীব মানুষ। আমার তেমন অর্থ-সম্পদ নেই। কো‌নোম‌তে খে‌য়ে প‌ড়ে দিন চ‌লে যায়। ত‌বে কোনোদিন কা‌রো কা‌ছে সাহায্য চাই‌নি। বরপক্ষের কোনো দাবি দা‌ওয়া নেই। কিন্তু যে পাঁচটা মানুষ আসবে তাদেরকে তো আপ্যায়ন না করে পারা যায় না!

আমি বললাম, যে কাজে গিয়েছিলেন কিছু হলো? তি‌নি বল‌লেন, হ্যাঁ, ‌কিছু হলো। তিনশ টাকা দিলেন। আর বললেন, প‌রে দে‌বেন বা‌কি টাকা। দেখি কারো কাছে ধার করে না হয় বিয়েটা পার করব। পরে আবার একদিন আসব।

বাবাজির মুখটা শুকনা দেখে খুব মায়া হলো। তিনি উঠে চলে যাচ্ছিলেন। আমি একটু দাঁড়াতে বললাম। দোকানের টে‌বি‌লের ড্রয়ার ও মানিব্যাগ হাতড়িয়ে এক জায়গায় করলাম। সব মিলে দুইশ কু‌ড়ি টাকা হলো। কুড়ি টাকা ড্রয়ারে রেখে দুইশ টাকা তার হাতে ধ‌রি‌য়ে দিলাম। বৃদ্ধের দু’চোখ বেয়ে অ‌ঝোর ধারায় জল বেরিয়ে এল। তিনি বললেন, বড় আশা করে মেম্বা‌রের কা‌ছে গি‌য়েছিলাম। ভেবেছিলাম অন্তত পাঁচশ টাকা হলেও আমার প্র‌য়োজন মি‌টে যেত। কিন্তু সেখানে গিয়ে পেলাম মাত্র তিনশ টাকা। তাই মনে কষ্ট নিয়েই ফি‌রে যাচ্ছিলাম।

আমি বললাম, চাচা এতে হবে তো?
তিনি বললেন, আলহামদুলিল্লাহ। য‌থেষ্ট হবে। আসলে তি‌নি নিজ চোখে দেখলেন আমার অবস্থা। আমি চেষ্টার কোনো কমতি করিনি। তাই হয়তো আর চাইলেন না। তিনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কান্না বিজড়িয় কণ্ঠে আমার জন্য অনেক দোয়া করলেন। তারপর চলে গেলেন। বুঝলাম, মানুষ কতটা অসহায় হলে অন্যের কা‌ছে হাত পাতে। মেয়ের বিয়েতে কেউ কোটি টাকা যৌতুক দেয়। আবার কেউ কোটি টাকায় বিয়ের অনুষ্ঠান করে। আবার কোন‌ো পিতার সংসারে একটা বিবাহ যোগ্যা মে‌য়ে তার জীবনে অভিশাপ হয়ে ওঠে। নিজের লজ্জা-শরম ভু‌লে অন্যের দারস্থ হ‌তে হয়। আর মাত্র পাঁচশত টাকায় তার মেয়ের বিবাহের অনুষ্ঠান হয়ে যায়। ইসলামের দৃষ্টিতে এটিই হলো আসল বিয়ের অনুষ্ঠান। আর লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিয়ের অনুষ্ঠান করার নামই অপচয়।